মূল বিষয়বস্তুতে যান
    লেটারহেড
    মুস্তাফতির নাম:Mddidarulalam
    ঠিকানা:Banasree
    প্রশ্নের বিষয়:মুআমালাত
    প্রসঙ্গ:তালাক-ই-তওফিজ/তালাকের শরয়ী বিধান
    ফতওয়া নং:FTW-1058
    তারিখ:৫ অক্টোবর, ২০২৬
    ই-মেইল:info@durus.bd
    প্রশ্ন السؤال

    আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।

    তারিখ: ০৩ অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ

    বরাবর সম্মানিত মুফতি সাহেব/দারুল ইফতা বিভাগ মারকাযুদ দুরুস আল ইসলামিয়া

    বিষয়: তালাক-ই-তওফিজ/তালাকের শরয়ী বিধান এবং পুনরায় দাম্পত্য জীবনে প্রত্যাবর্তনের শরয়ী পদ্ধতি সম্পর্কে লিখিত ফতোয়া প্রার্থনা।

    মহোদয়,

    বিনীত নিবেদন এই যে, আমি মোঃ সোয়াইব, স্থায়ী/বর্তমান ঠিকানা: মিরসরাই, চট্টগ্রাম। আমি ও আমার স্ত্রী শরয়ী নিয়মে ১৯/১১/২০১৭ খ্রিষ্টাব্দ তারিখে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হই। বিবাহের প্রাথমিক সময়ে আমাদের দাম্পত্য জীবন স্বাভাবিক ও শান্তিপূর্ণ ছিল। পরবর্তীতে, বিশেষত ২০১৯ সাল থেকে, পারিবারিক ও দাম্পত্য বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে আমাদের মধ্যে মতবিরোধ, মনোমালিন্য ও পারিবারিক জটিলতার সৃষ্টি হয়।

    পরবর্তীতে ২৩/০৯/২০২০ খ্রিষ্টাব্দ তারিখে চট্টগ্রামস্থ সিনিয়র সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট/নোটারি পাবলিকের কার্যালয়ে উপস্থিত সাক্ষীদের সম্মুখে আমার স্ত্রী কর্তৃক একটি লিখিত নোটারি ডিভোর্স/তালাকনামা সম্পাদন/প্রেরণ করা হয়। উক্ত দলিলে কাবিননামায় স্ত্রীকে অর্পিত তালাক-ই-তাফওয়ীজ (তালাক প্রদানের ক্ষমতা)-এর উল্লেখ ছিল। উক্ত সময়ে আমার স্ত্রী একসঙ্গে তিন তালাক প্রদানের বিষয় উল্লেখ করেন।

    বর্তমানে আমরা উক্ত ঘটনার শরয়ী অবস্থান সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্ত জানতে আগ্রহী। বিশেষ করে, তালাক-ই-তাফওয়ীজের অধিকার, একসঙ্গে তিন তালাকের বিধান, নোটারি দলিলের শরয়ী প্রভাব এবং বর্তমানে পুনরায় দাম্পত্য জীবনে প্রত্যাবর্তনের কোনো বৈধ সুযোগ থাকলে তার সঠিক পদ্ধতি সম্পর্কে লিখিত ফতোয়া জানা আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

    এ বিষয়ে কুরআন-সুন্নাহ এবং ফিকহে হানাফীর নির্ভরযোগ্য মূলনীতি ও কিতাবসমূহের আলোকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো সম্পর্কে শরয়ী ফতোয়া প্রার্থনা করছি:

    ফতোয়া প্রার্থীত বিষয়সমূহ

    ১। আমাদের কাবিননামায় স্ত্রীকে যদি তালাক-ই-তাফওয়ীজ-এর অধিকার প্রদান করা হয়ে থাকে, তাহলে সেই অধিকারের ভিত্তিতে স্ত্রী একসঙ্গে ৩ (তিন) তালাক প্রদান করলে ফিকহে হানাফীর দৃষ্টিতে প্রকৃতপক্ষে কত তালাক সংঘটিত হয়েছে? এক তালাক রাজঈ হিসেবে গণ্য হবে, নাকি তিন তালাকই কার্যকর বলে গণ্য হবে?

    ২। ২৩/০৯/২০২০ খ্রিষ্টাব্দে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে সম্পাদিত/প্রেরিত লিখিত দলিলের মাধ্যমে স্ত্রী কর্তৃক প্রদত্ত তালাক শরয়ী দৃষ্টিতে আদৌ সংঘটিত ও কার্যকর হয়েছে কি না—এ বিষয়ে বিস্তারিত শরয়ী হুকুম কী? কার্যকর হয়ে থাকলে, তার শরয়ী প্রকৃতি ও প্রয়োজনীয় শর্তসমূহ কী ছিল/আছে?

    ৩। যদি উক্ত তালাক শরয়ীভাবে সংঘটিত হয়ে থাকে এবং পরবর্তীতে ইদ্দতের সময় অতিবাহিত হয়ে যায়, তাহলে বর্তমান সময়ে আমাদের পুনরায় স্বামী-স্ত্রী হিসেবে একত্রে বসবাস করার শরয়ী পদ্ধতি কী?

    ৪। এ ক্ষেত্রে যদি পুনরায় দাম্পত্য জীবন শুরু করার সুযোগ শরীয়তে বিদ্যমান থাকে, তাহলে কি নতুন করে দেনমোহর নির্ধারণ করে নতুন আকদ/নিকাহ সম্পাদন করতে হবে, নাকি পূর্বের নিকাহের ভিত্তিতেই পুনরায় দাম্পত্য জীবন শুরু করা বৈধ হবে?

    ৫। যদি একসঙ্গে প্রদত্ত তিন তালাক শরয়ীভাবে তিন তালাক হিসেবেই কার্যকর হয়ে থাকে, তাহলে বর্তমানে আমাদের পুনরায় বিবাহ/দাম্পত্য জীবনে প্রত্যাবর্তনের শরয়ী বিধান কী হবে—এ বিষয়েও সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রদানের অনুরোধ করছি।

    অতএব, উপরোক্ত ঘটনার প্রকৃত তথ্য ও দলিলাদি বিবেচনা করে মহাগ্রন্থ আল-কুরআন, হাদিস ও ফিকহে হানাফীর নির্ভরযোগ্য কিতাবসমূহের আলোকে আমাদের বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট ও লিখিত ফতোয়া প্রদান করার জন্য বিনীতভাবে আবেদন করছি।

    বিশেষভাবে অনুরোধ করছি, ফতোয়ার ক্ষেত্রে তালাক-ই-তাফওয়ীজের প্রকৃতি, কাবিননামায় প্রদত্ত ক্ষমতার ভাষা, ২৩/০৯/২০২০ তারিখের লিখিত দলিলের বক্তব্য এবং স্ত্রী কর্তৃক ব্যবহৃত তালাকের শব্দসমূহ বিবেচনা করে শরয়ী সিদ্ধান্ত প্রদান করা হোক।

    নিবেদক মোঃ সোয়াইব ঠিকানা: মিরসরাই, চট্টগ্রাম মোবাইল: ০১৮৪০-১৪৯৭২১

    باسْمه تعالى حَامِدًا وَّمُصَلِّيًا وَّمُسَلِّمًا أَمَّا بَعْدُ

    فَالْجَوَابُ وَبِاللهِ التَّوْفِيقُ

    ফিকহে হানাফীর মূলনীতির আলোকে আপনার প্রশ্নগুলোর সুনির্দিষ্ট উত্তর নিচে ধারাবাহিকভাবে দেওয়া হলো:

    ১. তালাক-ই-তাফয়ীজ এবং তিন তালাকের বিধান: ইসলামী শরীয়তে 'তালাকে তাফয়ীজ' বা স্ত্রীর প্রতি তালাক প্রদানের ক্ষমতা অর্পণের মূলনীতি হলো, স্বামী স্ত্রীকে ঠিক যতটুকু ক্ষমতা প্রদান করবেন, স্ত্রী কেবল ততটুকুই প্রয়োগ করতে পারবেন। এর বাইরে প্রয়োগ করলে তা বাতিল হবে। বাংলাদেশের সরকারি কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামে সাধারণত স্ত্রীকে কেবল একটি 'তালাকে বায়েন' (পূর্ণ বিচ্ছেদ) প্রদানের ক্ষমতা দেওয়া থাকে।

    যদি আপনাদের কাবিননামায় সাধারণ নিয়মে ক্ষমতা দেওয়া হয়ে থাকে এবং সেখানে 'তিন তালাক' দেওয়ার কথা সুনির্দিষ্টভাবে লেখা না থাকে, তবে আপনার স্ত্রী নোটারির মাধ্যমে 'তিন তালাক' উল্লেখ করলেও শরীয়ত অনুযায়ী তার ১টির বেশি তালাক দেওয়ার ক্ষমতা না থাকায় কেবল ১টি তালাকে বায়েন পতিত হয়েছে। তিন তালাক কার্যকর হয়নি। তবে স্বামী যদি কাবিননামায় স্পষ্টাক্ষরে লিখে থাকেন যে, "স্ত্রী নিজেকে ১, ২ বা ৩ তালাক দিতে পারবে", কেবল তখনই স্ত্রীর দেওয়া তিন তালাক পতিত হয়ে তিন তালাক পূর্ণ হবে।

    ২. নোটারি দলিলের শরয়ী প্রভাব ও কার্যকারিতা: স্ত্রী তালাক নিজে দিতে পারে না। তবে গ্রহণ করতে পারে। স্ত্রী যেমন মুখে নিজের উপর তালাক গ্রহণ করতে পারে, তেমনি লিখিতভাবেও নিজের উপর তালাক নিতে পারে। তাই কাবিননামায় তালাক প্রদানের বৈধ শর্তগুলো যদি বাস্তবে লঙ্ঘিত হয়ে থাকে এবং স্ত্রী সেই অধিকার বলে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে লিখিতভাবে ডিভোর্স লেটার সম্পাদন করে পাঠিয়ে থাকেন অর্থাৎ তাফউইজের ক্ষমতা বলে নিজের উপর তালাক গ্রহণ করে থাকেন, তাহলে সাথে সাথেই শরয়ী নিয়মে তা কার্যকর হয়ে গেছে।

    ৩ ও ৪. পুনরায় দাম্পত্য জীবনে প্রত্যাবর্তনের পদ্ধতি ও নতুন আকদের বিধান: যেহেতু কাবিননামার সাধারণ ক্ষমতাবলে স্ত্রীর লিখিত তালাকের কারণে ১ তালাকে বায়েন কার্যকর হয়েছে। এখন পূর্বের কাবিনের ভিত্তিতে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে একত্রে বসবাস করা সম্পূর্ণ হারাম।

    তবে সুখবর হল-- আপনাদের পুনরায় দাম্পত্য জীবন শুরু করার সুযোগ বিদ্যমান আছে। আপনাদেরকে অবশ্যই সম্পূর্ণ নতুন করে মোহরানা নির্ধারণ করে, অন্তত দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম সাক্ষীর উপস্থিতিতে নতুনভাবে ইজাব ও কবুল সম্পন্ন করে দাম্পত্য জীবন শুরু করতে হবে।

    ৫. তিন তালাক কার্যকর হওয়ার সুরতে বিধান: যদি আপনাদের কাবিননামায় স্ত্রীকে স্পষ্টাক্ষরে তিন তালাক গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া হয়ে থাকে এবং তার ভিত্তিতে স্ত্রী তিন তালাক গ্রহণ সে করে থাকে, তবেই তা 'তালাকে মুগাল্লাজাহ' বা ৩ তালাক হিসেবে কার্যকর হবে। তবে আপনাদের নিকাহনামা দেখে ১ তালাকের ক্ষমতা দিয়েছেন দেখা গেছে। তাই ১ তালাকই গণ্য হবে।

    ১৩ তালাকের পর করনীয়

    فَإِنْ طَلَّقَهَا فَلَا تَحِلُّ لَهُ مِنْ بَعْدُ حَتَّى تَنْكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ অর্থ: অতঃপর সে (স্বামী) যদি তাকে (তৃতীয়) তালাক দিয়ে দেয়, তবে সে নারী তার জন্য হালাল হবে না, যে পর্যন্ত না সে অন্য স্বামীর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়। (সূরা আল-বাকারা: ২৩০)

    ◆ আল-কুরআন — সূরা: আল-বাকারা — পারা: ১ — আয়াত: ২৩০

    ২তালাক-ই-তাফয়ীজ (স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা প্রদান) এবং ক্ষমতার সীমা:

    فَإِنْ فَوَّضَ إلَيْهَا طَلْقَةً وَاحِدَةً لَا تَمْلِكُ الثَّلَاثَ، وَإِنْ فَوَّضَ إلَيْهَا الثَّلَاثَ تَمْلِكُ الْوَاحِدَةَ وَالثِّنْتَيْنِ وَالثَّلَاثَ অর্থ: স্বামী যদি স্ত্রীকে এক তালাকের ক্ষমতা দেয়, তবে স্ত্রী তিন তালাকের মালিক হবে না (তিন তালাক দিলেও পতিত হবে না)। আর যদি স্বামী তিন তালাকের ক্ষমতা দেয়, তবে স্ত্রী এক, দুই বা তিন তালাকের মালিক হবে। (রদ্দুল মুহতার/ফতোয়ায়ে শামী: ৪/৫৮২, কিতাবুত তালাক, তাফয়ীজ অধ্যায়)

    ◆ ফাতাওয়া শামী (রদ্দুল মুহতার) — খণ্ড: ৪ — পৃষ্ঠা: ৫৮২

    ৩স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা প্রদান এবং ক্ষমতার সীমা:

    لِأَنَّهَا تَسْتَفِيدُ التَّطْلِيقَ مِنْ جِهَتِهِ فَتَمْلِكُهُ عَلَى الْوَجْهِ الَّذِي جَعَلَهُ لَهَا অর্থ: কারণ স্ত্রী তালাক দেওয়ার ক্ষমতাটি স্বামীর পক্ষ থেকেই লাভ করে থাকে, সুতরাং স্বামী তাকে ঠিক যেভাবে (বা যে পরিমাণ) ক্ষমতা দেবে, সে কেবল তারই মালিক হবে। (বাদায়েউস সানায়ে: ৩/১১৭)

    ◆ বাদায়েউস সানায়ি — খণ্ড: ৩ — পৃষ্ঠা: ১১৭

    ৪লিখিত তালাক (নোটারি দলিল) কার্যকর হওয়া

    الطلاق يقع بالكتابة كما يقع باللفظ... فإن كانت مرسومة يقع الطلاق وإن لم ينو. অর্থ: মুখের উচ্চারণের মতো লেখার মাধ্যমেও তালাক পতিত হয়। যদি লেখাটি 'মারসুমাহ' (অর্থাৎ সুস্পষ্ট ও নির্দিষ্ট ঠিকানায় সম্বোধনকৃত) হয়, তবে নিয়ত না থাকলেও তালাক পতিত হয়ে যায়। (ফতোয়ায়ে আলমগীরী/হিন্দিয়া: ১/৩৭৮, কিতাবুত তালাক)

    ◆ ফাতাওয়া আলমগিরী (ফাতাওয়া হিন্দিয়া) — খণ্ড: ১ — পৃষ্ঠা: ৩৭৮

    ৫তালাকে বায়েন-এর পর নতুন করে বিবাহের (তাজদীদে নিকাহ) দলীল:

    وَإِذَا كَانَ الطَّلَاقُ بَائِنًا دُونَ الثَّلَاثِ فَلَهُ أَنْ يَتَزَوَّجَهَا فِي الْعِدَّةِ وَبَعْدَ انْقِضَائِهَا. অর্থ: তালাক যদি তালাকে বায়েন হয় এবং তিন তালাক না হয়, তবে স্বামী ইদ্দতের ভেতরে অথবা ইদ্দত শেষ হওয়ার পর উভয় অবস্থাতেই (নতুন মোহর ও নতুন আকদের মাধ্যমে) স্ত্রীকে পুনরায় বিবাহ করতে পারবে। (আল-হিদায়া: ২/৩৯৬, কিতাবুত তালাক, বাবুর্‌‌ রাজআত)

    ◆ আল-হিদায়া — খণ্ড: ২ — পৃষ্ঠা: ৩৯৬

    وَاللهُ أَعْلَمُ بِالصَّوَابِ

    —

    মুফতি, দারুল ইফতা বিভাগ

    স্বাক্ষর ও সীলমোহর

    লেটারহেড
    মুস্তাফতির নাম:Mddidarulalam
    ঠিকানা:Banasree
    প্রশ্নের বিষয়:মুআমালাত
    প্রসঙ্গ:তালাক-ই-তওফিজ/তালাকের শরয়ী বিধান
    ফতওয়া নং:FTW-1058
    তারিখ:৫ অক্টোবর, ২০২৬
    ই-মেইল:info@durus.bd
    প্রশ্ন السؤال

    আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।

    তারিখ: ০৩ অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ

    বরাবর সম্মানিত মুফতি সাহেব/দারুল ইফতা বিভাগ মারকাযুদ দুরুস আল ইসলামিয়া

    বিষয়: তালাক-ই-তওফিজ/তালাকের শরয়ী বিধান এবং পুনরায় দাম্পত্য জীবনে প্রত্যাবর্তনের শরয়ী পদ্ধতি সম্পর্কে লিখিত ফতোয়া প্রার্থনা।

    মহোদয়,

    বিনীত নিবেদন এই যে, আমি মোঃ সোয়াইব, স্থায়ী/বর্তমান ঠিকানা: মিরসরাই, চট্টগ্রাম। আমি ও আমার স্ত্রী শরয়ী নিয়মে ১৯/১১/২০১৭ খ্রিষ্টাব্দ তারিখে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হই। বিবাহের প্রাথমিক সময়ে আমাদের দাম্পত্য জীবন স্বাভাবিক ও শান্তিপূর্ণ ছিল। পরবর্তীতে, বিশেষত ২০১৯ সাল থেকে, পারিবারিক ও দাম্পত্য বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে আমাদের মধ্যে মতবিরোধ, মনোমালিন্য ও পারিবারিক জটিলতার সৃষ্টি হয়।

    পরবর্তীতে ২৩/০৯/২০২০ খ্রিষ্টাব্দ তারিখে চট্টগ্রামস্থ সিনিয়র সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট/নোটারি পাবলিকের কার্যালয়ে উপস্থিত সাক্ষীদের সম্মুখে আমার স্ত্রী কর্তৃক একটি লিখিত নোটারি ডিভোর্স/তালাকনামা সম্পাদন/প্রেরণ করা হয়। উক্ত দলিলে কাবিননামায় স্ত্রীকে অর্পিত তালাক-ই-তাফওয়ীজ (তালাক প্রদানের ক্ষমতা)-এর উল্লেখ ছিল। উক্ত সময়ে আমার স্ত্রী একসঙ্গে তিন তালাক প্রদানের বিষয় উল্লেখ করেন।

    বর্তমানে আমরা উক্ত ঘটনার শরয়ী অবস্থান সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্ত জানতে আগ্রহী। বিশেষ করে, তালাক-ই-তাফওয়ীজের অধিকার, একসঙ্গে তিন তালাকের বিধান, নোটারি দলিলের শরয়ী প্রভাব এবং বর্তমানে পুনরায় দাম্পত্য জীবনে প্রত্যাবর্তনের কোনো বৈধ সুযোগ থাকলে তার সঠিক পদ্ধতি সম্পর্কে লিখিত ফতোয়া জানা আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

    এ বিষয়ে কুরআন-সুন্নাহ এবং ফিকহে হানাফীর নির্ভরযোগ্য মূলনীতি ও কিতাবসমূহের আলোকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো সম্পর্কে শরয়ী ফতোয়া প্রার্থনা করছি:

    ফতোয়া প্রার্থীত বিষয়সমূহ

    ১। আমাদের কাবিননামায় স্ত্রীকে যদি তালাক-ই-তাফওয়ীজ-এর অধিকার প্রদান করা হয়ে থাকে, তাহলে সেই অধিকারের ভিত্তিতে স্ত্রী একসঙ্গে ৩ (তিন) তালাক প্রদান করলে ফিকহে হানাফীর দৃষ্টিতে প্রকৃতপক্ষে কত তালাক সংঘটিত হয়েছে? এক তালাক রাজঈ হিসেবে গণ্য হবে, নাকি তিন তালাকই কার্যকর বলে গণ্য হবে?

    ২। ২৩/০৯/২০২০ খ্রিষ্টাব্দে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে সম্পাদিত/প্রেরিত লিখিত দলিলের মাধ্যমে স্ত্রী কর্তৃক প্রদত্ত তালাক শরয়ী দৃষ্টিতে আদৌ সংঘটিত ও কার্যকর হয়েছে কি না—এ বিষয়ে বিস্তারিত শরয়ী হুকুম কী? কার্যকর হয়ে থাকলে, তার শরয়ী প্রকৃতি ও প্রয়োজনীয় শর্তসমূহ কী ছিল/আছে?

    ৩। যদি উক্ত তালাক শরয়ীভাবে সংঘটিত হয়ে থাকে এবং পরবর্তীতে ইদ্দতের সময় অতিবাহিত হয়ে যায়, তাহলে বর্তমান সময়ে আমাদের পুনরায় স্বামী-স্ত্রী হিসেবে একত্রে বসবাস করার শরয়ী পদ্ধতি কী?

    ৪। এ ক্ষেত্রে যদি পুনরায় দাম্পত্য জীবন শুরু করার সুযোগ শরীয়তে বিদ্যমান থাকে, তাহলে কি নতুন করে দেনমোহর নির্ধারণ করে নতুন আকদ/নিকাহ সম্পাদন করতে হবে, নাকি পূর্বের নিকাহের ভিত্তিতেই পুনরায় দাম্পত্য জীবন শুরু করা বৈধ হবে?

    ৫। যদি একসঙ্গে প্রদত্ত তিন তালাক শরয়ীভাবে তিন তালাক হিসেবেই কার্যকর হয়ে থাকে, তাহলে বর্তমানে আমাদের পুনরায় বিবাহ/দাম্পত্য জীবনে প্রত্যাবর্তনের শরয়ী বিধান কী হবে—এ বিষয়েও সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রদানের অনুরোধ করছি।

    অতএব, উপরোক্ত ঘটনার প্রকৃত তথ্য ও দলিলাদি বিবেচনা করে মহাগ্রন্থ আল-কুরআন, হাদিস ও ফিকহে হানাফীর নির্ভরযোগ্য কিতাবসমূহের আলোকে আমাদের বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট ও লিখিত ফতোয়া প্রদান করার জন্য বিনীতভাবে আবেদন করছি।

    বিশেষভাবে অনুরোধ করছি, ফতোয়ার ক্ষেত্রে তালাক-ই-তাফওয়ীজের প্রকৃতি, কাবিননামায় প্রদত্ত ক্ষমতার ভাষা, ২৩/০৯/২০২০ তারিখের লিখিত দলিলের বক্তব্য এবং স্ত্রী কর্তৃক ব্যবহৃত তালাকের শব্দসমূহ বিবেচনা করে শরয়ী সিদ্ধান্ত প্রদান করা হোক।

    নিবেদক মোঃ সোয়াইব ঠিকানা: মিরসরাই, চট্টগ্রাম মোবাইল: ০১৮৪০-১৪৯৭২১

    باسْمه تعالى حَامِدًا وَّمُصَلِّيًا وَّمُسَلِّمًا أَمَّا بَعْدُ

    فَالْجَوَابُ وَبِاللهِ التَّوْفِيقُ

    ফিকহে হানাফীর মূলনীতির আলোকে আপনার প্রশ্নগুলোর সুনির্দিষ্ট উত্তর নিচে ধারাবাহিকভাবে দেওয়া হলো:

    ১. তালাক-ই-তাফয়ীজ এবং তিন তালাকের বিধান: ইসলামী শরীয়তে 'তালাকে তাফয়ীজ' বা স্ত্রীর প্রতি তালাক প্রদানের ক্ষমতা অর্পণের মূলনীতি হলো, স্বামী স্ত্রীকে ঠিক যতটুকু ক্ষমতা প্রদান করবেন, স্ত্রী কেবল ততটুকুই প্রয়োগ করতে পারবেন। এর বাইরে প্রয়োগ করলে তা বাতিল হবে। বাংলাদেশের সরকারি কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামে সাধারণত স্ত্রীকে কেবল একটি 'তালাকে বায়েন' (পূর্ণ বিচ্ছেদ) প্রদানের ক্ষমতা দেওয়া থাকে।

    যদি আপনাদের কাবিননামায় সাধারণ নিয়মে ক্ষমতা দেওয়া হয়ে থাকে এবং সেখানে 'তিন তালাক' দেওয়ার কথা সুনির্দিষ্টভাবে লেখা না থাকে, তবে আপনার স্ত্রী নোটারির মাধ্যমে 'তিন তালাক' উল্লেখ করলেও শরীয়ত অনুযায়ী তার ১টির বেশি তালাক দেওয়ার ক্ষমতা না থাকায় কেবল ১টি তালাকে বায়েন পতিত হয়েছে। তিন তালাক কার্যকর হয়নি। তবে স্বামী যদি কাবিননামায় স্পষ্টাক্ষরে লিখে থাকেন যে, "স্ত্রী নিজেকে ১, ২ বা ৩ তালাক দিতে পারবে", কেবল তখনই স্ত্রীর দেওয়া তিন তালাক পতিত হয়ে তিন তালাক পূর্ণ হবে।

    ২. নোটারি দলিলের শরয়ী প্রভাব ও কার্যকারিতা: স্ত্রী তালাক নিজে দিতে পারে না। তবে গ্রহণ করতে পারে। স্ত্রী যেমন মুখে নিজের উপর তালাক গ্রহণ করতে পারে, তেমনি লিখিতভাবেও নিজের উপর তালাক নিতে পারে। তাই কাবিননামায় তালাক প্রদানের বৈধ শর্তগুলো যদি বাস্তবে লঙ্ঘিত হয়ে থাকে এবং স্ত্রী সেই অধিকার বলে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে লিখিতভাবে ডিভোর্স লেটার সম্পাদন করে পাঠিয়ে থাকেন অর্থাৎ তাফউইজের ক্ষমতা বলে নিজের উপর তালাক গ্রহণ করে থাকেন, তাহলে সাথে সাথেই শরয়ী নিয়মে তা কার্যকর হয়ে গেছে।

    ৩ ও ৪. পুনরায় দাম্পত্য জীবনে প্রত্যাবর্তনের পদ্ধতি ও নতুন আকদের বিধান: যেহেতু কাবিননামার সাধারণ ক্ষমতাবলে স্ত্রীর লিখিত তালাকের কারণে ১ তালাকে বায়েন কার্যকর হয়েছে। এখন পূর্বের কাবিনের ভিত্তিতে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে একত্রে বসবাস করা সম্পূর্ণ হারাম।

    তবে সুখবর হল-- আপনাদের পুনরায় দাম্পত্য জীবন শুরু করার সুযোগ বিদ্যমান আছে। আপনাদেরকে অবশ্যই সম্পূর্ণ নতুন করে মোহরানা নির্ধারণ করে, অন্তত দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম সাক্ষীর উপস্থিতিতে নতুনভাবে ইজাব ও কবুল সম্পন্ন করে দাম্পত্য জীবন শুরু করতে হবে।

    ৫. তিন তালাক কার্যকর হওয়ার সুরতে বিধান: যদি আপনাদের কাবিননামায় স্ত্রীকে স্পষ্টাক্ষরে তিন তালাক গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া হয়ে থাকে এবং তার ভিত্তিতে স্ত্রী তিন তালাক গ্রহণ সে করে থাকে, তবেই তা 'তালাকে মুগাল্লাজাহ' বা ৩ তালাক হিসেবে কার্যকর হবে। তবে আপনাদের নিকাহনামা দেখে ১ তালাকের ক্ষমতা দিয়েছেন দেখা গেছে। তাই ১ তালাকই গণ্য হবে।

    ১৩ তালাকের পর করনীয়

    فَإِنْ طَلَّقَهَا فَلَا تَحِلُّ لَهُ مِنْ بَعْدُ حَتَّى تَنْكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ অর্থ: অতঃপর সে (স্বামী) যদি তাকে (তৃতীয়) তালাক দিয়ে দেয়, তবে সে নারী তার জন্য হালাল হবে না, যে পর্যন্ত না সে অন্য স্বামীর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়। (সূরা আল-বাকারা: ২৩০)

    ◆ আল-কুরআন — সূরা: আল-বাকারা — পারা: ১ — আয়াত: ২৩০

    ২তালাক-ই-তাফয়ীজ (স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা প্রদান) এবং ক্ষমতার সীমা:

    فَإِنْ فَوَّضَ إلَيْهَا طَلْقَةً وَاحِدَةً لَا تَمْلِكُ الثَّلَاثَ، وَإِنْ فَوَّضَ إلَيْهَا الثَّلَاثَ تَمْلِكُ الْوَاحِدَةَ وَالثِّنْتَيْنِ وَالثَّلَاثَ অর্থ: স্বামী যদি স্ত্রীকে এক তালাকের ক্ষমতা দেয়, তবে স্ত্রী তিন তালাকের মালিক হবে না (তিন তালাক দিলেও পতিত হবে না)। আর যদি স্বামী তিন তালাকের ক্ষমতা দেয়, তবে স্ত্রী এক, দুই বা তিন তালাকের মালিক হবে। (রদ্দুল মুহতার/ফতোয়ায়ে শামী: ৪/৫৮২, কিতাবুত তালাক, তাফয়ীজ অধ্যায়)

    ◆ ফাতাওয়া শামী (রদ্দুল মুহতার) — খণ্ড: ৪ — পৃষ্ঠা: ৫৮২

    ৩স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা প্রদান এবং ক্ষমতার সীমা:

    لِأَنَّهَا تَسْتَفِيدُ التَّطْلِيقَ مِنْ جِهَتِهِ فَتَمْلِكُهُ عَلَى الْوَجْهِ الَّذِي جَعَلَهُ لَهَا অর্থ: কারণ স্ত্রী তালাক দেওয়ার ক্ষমতাটি স্বামীর পক্ষ থেকেই লাভ করে থাকে, সুতরাং স্বামী তাকে ঠিক যেভাবে (বা যে পরিমাণ) ক্ষমতা দেবে, সে কেবল তারই মালিক হবে। (বাদায়েউস সানায়ে: ৩/১১৭)

    ◆ বাদায়েউস সানায়ি — খণ্ড: ৩ — পৃষ্ঠা: ১১৭

    ৪লিখিত তালাক (নোটারি দলিল) কার্যকর হওয়া

    الطلاق يقع بالكتابة كما يقع باللفظ... فإن كانت مرسومة يقع الطلاق وإن لم ينو. অর্থ: মুখের উচ্চারণের মতো লেখার মাধ্যমেও তালাক পতিত হয়। যদি লেখাটি 'মারসুমাহ' (অর্থাৎ সুস্পষ্ট ও নির্দিষ্ট ঠিকানায় সম্বোধনকৃত) হয়, তবে নিয়ত না থাকলেও তালাক পতিত হয়ে যায়। (ফতোয়ায়ে আলমগীরী/হিন্দিয়া: ১/৩৭৮, কিতাবুত তালাক)

    ◆ ফাতাওয়া আলমগিরী (ফাতাওয়া হিন্দিয়া) — খণ্ড: ১ — পৃষ্ঠা: ৩৭৮

    ৫তালাকে বায়েন-এর পর নতুন করে বিবাহের (তাজদীদে নিকাহ) দলীল:

    وَإِذَا كَانَ الطَّلَاقُ بَائِنًا دُونَ الثَّلَاثِ فَلَهُ أَنْ يَتَزَوَّجَهَا فِي الْعِدَّةِ وَبَعْدَ انْقِضَائِهَا. অর্থ: তালাক যদি তালাকে বায়েন হয় এবং তিন তালাক না হয়, তবে স্বামী ইদ্দতের ভেতরে অথবা ইদ্দত শেষ হওয়ার পর উভয় অবস্থাতেই (নতুন মোহর ও নতুন আকদের মাধ্যমে) স্ত্রীকে পুনরায় বিবাহ করতে পারবে। (আল-হিদায়া: ২/৩৯৬, কিতাবুত তালাক, বাবুর্‌‌ রাজআত)

    ◆ আল-হিদায়া — খণ্ড: ২ — পৃষ্ঠা: ৩৯৬

    وَاللهُ أَعْلَمُ بِالصَّوَابِ

    —

    মুফতি, দারুল ইফতা বিভাগ

    স্বাক্ষর ও সীলমোহর

    আপনারও মাসআলা আছে? লিখে প্রশ্ন করুন — উত্তর পেতে ৩/৪ দিন লাগতে পারে। ইমারজেন্সি হলে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন।